হাঁটতে হাঁটতে মনিকার কাছে চলে এল সে। মেয়েটার পরনে এখনো সাদা এপ্রনটা আছে, দুহাত বুকের নিচে একসাথে ভাঁজ করে রেখেছে, মাথাটা নিচু করা। পনিটেইল করা চুলগুলো উঁচু হয়ে আছে। হালকা সোনালী রঙে ডাই করেছে মনে হল। শেষ বিকেলের রোদে চিকচিক করছে মসৃণ চুলগুলো। তবে প্রতিদিনকার মত হাসিমুখটা আজ নেই। প্রচন্ড নার্ভাস মনে হচ্ছে। মাঝে মাঝে ডানে-বামে তাকিয়ে কেউ আছে কিনা লক্ষ্য করছে। স্যান্ডেলের খসখস শব্দ তুলে মতিন কাছে এসে গেছে। দুপাটি দাঁত বের করে বলল,
- ভাল আছেন আপা?
মাথা তুলে নার্ভাস ভঙ্গিতে হেসে বলল মনিকা,
- হ্যাঁ মতিন ভাই।
- আপা আমার কোর্টারে আসেন, এইটাই ভাল হবে, কি বলেন?
- কোয়ার্টারে তো মালী আর সুইপারের ফ্যামেলিও থাকে। কেউ সন্দেহ করবেনা?
খোয়া বিছানো পথ ধরে যেতে যেতে বলল মনিকা।
- না আপা, বিষ্যুদবারে সবাই কাজ শেষ কইরা বাইরে যায় বাজার ঘাট করতে। শুক্রবারে ইকলেজের নানা রকম কাম থাকে সকাল থেইকাই।
- মালীর মেয়েটা থাকেনা বাপ-মায়ের সাথে?
- হাঁ, কিন্তু রুম্পার প্রাইভেট আছে। সন্ধ্যার আগে আইবনা। তাছাড়া অতক্ষণ তো লাগবও না।
বিশ্রী ইঙ্গিত করে মনিকার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দেয় মতিন। মনিকা একটা ঢোক গেলে।
কলেজ বিল্ডিংয়ের দেয়াল দিয়ে ঘেরা স্টাফ কোয়ার্টার। একতলা টিন শেড ঘর কয়েকটি। সাদা রঙ করা সবগুলো ইটের দেয়াল। দুই রুম নিয়ে মালী থাকে ফ্যামেলি সহ। সুইপার দম্পতি থাকে এক রুমে আর এক রুমে থাকে মতিন। চারদিকে উঁচু দেয়াল ঘেরা জায়গাটায় ঘরের সামনে জায়গা খুব কম। রাবিশ বিছানো পুরোটা প্রাঙ্গনে। নারকেল গাছ আছে তিনটি। গাছগুলোতে সবসময়ই কচি ডাব ঝুলে থাকে। উপরের দিকে তাকিয়ে ঝকঝকে ডাবগুলোকে নিজের সুগঠিত স্তনের মতই মনে হল মনিকার। কোয়ার্টারের এক প্রান্তে খোলা কলপাড়সহ গোসলখানা, সামনে থেকে হালকা টিনের নামমাত্র বেড়া দেয়া। জীর্ণ এই পরিবেশে মতিনের থ্রী কোয়ার্টার আর রঙচঙে শার্ট, রাজকীয় হাবভাব সবই মেকি মেকি লাগছে। ভেজানো দরজা ঠেলে নিজের রুমটা খুলল মতিন। মালীর পরিবারের সাথেই খায় সে। বিয়ে থা করেনি, বাড়ির লোকজন ঘাড় ধরে কাউকে পার্মানেন্টলি গলায় ঝুলিয়ে দেবার আগ পর্যন্ত তার কোন উদ্যোগ নেই। অত তাড়াহুরারই বা কি আছে, সবে তো খেল শুরু হল। এখন তো হেড মাস্টারের সাথেও চুক্তিতে আসা গেছে।
ঠান্ডা পানি দিয়ে লেবুর শরবত বানিয়ে রেখেছিল মতিন। নিজে এক গ্লাস নিয়ে মনিকাকেও দিল। কিং সাইজ টেবিল ফ্যানটা চালু করে দিল সে। আফসারের মত ভুল করলনা মতিন। প্রথমেই স্টীলের দরজাটা বন্ধ করে নিল। উত্তরের জানালা দিয়ে পাশের সরকারী কলেজের পরিত্যক্ত ছাত্রী নিবাস দেখা যায়, সেখানে কারো আসার কথা নয় তার কাজে বিঘ্ন ঘটাতে।
নীরবতা ভেঙে কথা শুরু করল মনি,
- মতিন ভাই, বাসায় যেতে হবে তাড়াতাড়ি।
- ক্যান, বাসায় ফোন কইরা দেন নাই?
- দুলাভাইয়ের ফোন বন্ধ, চার্জ শেষ মনে হয়। বেশি রাত হয়ে গেলে উনি কলেজে এসে পড়বেন খুঁজতে।
- অসুবিধ নাই আপা, রাইত হবেনা।
মনিকার বাবা মা গ্রামেই থাকে। শহরে এসে বোনের বাসায় থেকে পড়ালেখা করছে সে, এর মধ্যেই চাকরীটা হয়ে গেছে। বাসায় আছে শুধু বড় বোন আর দুলাভাই।
0 Comments